রবিবার ৪ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৭:৩২
হযরত জয়নাব (সা.আ.): যে বন্দিত্ব রিসালতের সূচনা করেছিল

হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও অতুলনীয় ধৈর্যের অধিকারিণী এক মহীয়সী নারী। কারবালার সমস্ত বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)–এর সঙ্গে যাত্রা করেন এবং বন্দিত্বের কঠিন সময়ে তাঁর বজ্রকণ্ঠ ভাষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে আশুরার চিরন্তন বার্তাকে জীবন্ত ও স্থায়ী করে তোলেন। তাঁর ইন্তেকাল স্বাভাবিকভাবে হয়েছে নাকি তাঁকে শহীদ করা হয়েছে—এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হযরত জয়নাব (সা.আ.)–এর ইন্তেকাল সম্পর্কে প্রশ্নটি ইতিহাস গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং এ বিষয়ে বহু ঐতিহাসিক ও গবেষক মতামত প্রদান করেছেন।

হযরত জয়নাব (সা.আ.)–এর ইন্তেকাল
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, কারবালা পরবর্তী দুঃসহ কষ্ট, নির্যাতন ও গভীর মানসিক আঘাতের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করেন। এই মতটি তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, কারণ তিনি একের পর এক অসহনীয় বিপর্যয় ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন।

অন্যদিকে, কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ইয়াজিদের অনুসারীদের দ্বারা তিনি গোপনে বিষপ্রয়োগের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। এই সম্ভাবনাও পুরোপুরি অস্বীকারযোগ্য নয়, কারণ হযরত জয়নাব (সা.আ.) ছিলেন কারবালার জীবন্ত সাক্ষ্য ও ইয়াজিদি শাসনের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। স্বভাবতই ইয়াজিদ তাঁর অস্তিত্ব সহ্য করতে পারেনি। তবে এ ধরনের অপরাধ সাধারণত গোপনে সংঘটিত হওয়ায় সুস্পষ্ট প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায় না।

তাঁর ইন্তেকালের তারিখ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ মতানুসারে, তিনি হিজরি ৬২ সালের ১৫ রজব, রবিবার ইন্তেকাল করেন।

জন্ম, বিবাহ ও সন্তান
হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.) হিজরি ৫ বা ৬ সালের ৫ই জমাদিউল উলা, মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর নাম জয়নাব, কুনিয়াত উম্মুল হাসান ও উম্মে কুলসুম। তাঁর উপাধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: সিদ্দিকা সুগরা, ইসমাত সুগরা, ওলিয়াতুল্লাহিল উজমা, নামুসে কুবরা, শরীকাতুল হুসাইন (আ.), আলিমা গাইরে মুয়াল্লিমা, ফাযিলা, কামিলা প্রভৃতি।

তাঁর পিতা ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আ.) এবং মাতা সাইয়্যিদাতুন নিসা-ইল আলামীন হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)।
তাঁর স্বামী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবু তালিব।

গ্রন্থ ই‘লামুল ওয়ারী অনুযায়ী, তাঁর তিন পুত্র—আলী, আউন ও জাফর এবং এক কন্যা—উম্মে কুলসুম ছিলেন।

অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও স্মৃতিশক্তি
আসাওয়ার মিন যাহাব গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, হযরত জয়নাব (সা.আ.)–এর স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা ছিল বিস্ময়কর। তিনি শৈশবে মাত্র একবার শ্রবণ করেই হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–এর ঐতিহাসিক ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করেন এবং পরবর্তীতে তা বর্ণনা করেন।

এমনকি ইবনে আব্বাসের মতো মহান মুফাসসির ও আলেম তাঁর থেকে রেওয়ায়েত করেছেন এবং তাঁকে “আকীলাতুনা” (আমাদের বুদ্ধিমতী ও মর্যাদাশীল নারী) বলে সম্বোধন করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, তখন তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক সাত বছর বা তারও কম।

ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি গভীর ভালোবাসা
আল-খাসায়িসুয জয়নাবিয়্যাহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, শৈশবে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর দৃষ্টির আড়ালে গেলেই তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন এবং তাঁকে দেখলেই শান্ত হতেন। পরবর্তীতে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নামাজ আদায়ের পূর্বে প্রথমে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)–এর চেহারা দর্শন করতেন, তারপর নামাজে দাঁড়াতেন।

বিবাহের শর্ত: হুসাইনের সঙ্গে থাকা
বর্ণিত আছে, হযরত আলী (আ.) তাঁর কন্যা জয়নাব (সা.আ.)–এর বিবাহের সময় এই শর্ত আরোপ করেন যে, যখনই জয়নাব (সা.আ.) তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)–এর সঙ্গে সফর করতে চাইবেন, স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর তাঁকে বাধা দেবেন না।

পরবর্তীতে যখন ইমাম হুসাইন (আ.) কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন, আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর তাঁর দুই পুত্র আউন ও মুহাম্মদকে ইমাম হুসাইন (আ.)–এর সঙ্গে পাঠান, যারা কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণ করেন।

জয়নাব (সা.আ.): হুসাইনের মতোই সাহসী
শাইখ শুশতারী (রহ.) বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর একটি যুদ্ধক্ষেত্র ছিল কারবালার প্রান্তরে, আর হযরত জয়নাব (সা.)–এর দুটি—

১. উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের দরবার

২. ইয়াজিদের দরবার

এই দুই দরবারে তাঁর বজ্রকণ্ঠ ভাষণ ইয়াজিদি শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়।

দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ
স্বামীর গৃহে সব ধরনের আরাম-আয়েশ, দাস-দাসী ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও, হযরত জয়নাব (সা.আ.) সবকিছু ত্যাগ করে নিশ্চিত দুঃখ, বন্দিত্ব ও দুর্ভোগের পথে পা বাড়ান। তিনি জানতেন ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, তবুও সত্য ও ন্যায়ের পথে এক মুহূর্তও পিছিয়ে যাননি।

হুসাইন থেকে বিচ্ছেদ নয়
যখন ইবনে আব্বাস ইমাম হুসাইন (আ.)–কে নারীদের সঙ্গে না নেওয়ার পরামর্শ দেন, তখন হযরত জয়নাব (সা.আ.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেন: “আপনি কি আমাকে আমার ভাই হুসাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান? হুসাইন ছাড়া আমি কখনো থাকব না।”

বন্দিত্ব: জয়নাবের গৌরব ও আশুরার স্থায়িত্বের রহস্য
কারবালার ঘটনার পর হযরত জয়নাব (সা.আ.) প্রায় এক বছর ছয় মাস জীবিত ছিলেন। কুফা ও শামে বন্দিত্বকালে তিনি ও ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যৌথভাবে কারবালার বন্দিদের নেতৃত্ব দেন।

ইবনে জিয়াদের দরবারে তাঁর ঐতিহাসিক উত্তর ছিল: “আমি সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। শাহাদাত তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল।”

তিনি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)–এর প্রাণরক্ষা করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হন। শামের দরবারে তাঁর ভাষণ ইয়াজিদের বিজয়োৎসবকে শোক ও লজ্জায় রূপান্তরিত করে।

পরবর্তীতে মদিনায় ফিরে তিনি ইয়াজিদের জুলুমের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করেন। এর ফলস্বরূপ তাঁকে নির্বাসিত করা হয়। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তিনি শামে ইন্তেকাল করেন; অন্য বর্ণনায় বলা হয়, তিনি মিসরে হিজরি ৬২ সালের ১৫ রজব ইন্তেকাল করেন।

সূত্রসমূহ:

১. মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃ. ৬৭

২. জয়নাবুল কুবরা মিনাল মাহদি ইলাল লাহদ, পৃ. ৫৯২

৩. লুহূফ, পৃ. ২১৮; মুকররম, মাকতালুল হুসাইন, পৃ. ৩২৪; আল-ইরশাদ, খণ্ড ২, পৃ. ১৪৪

৪. আল-ইরশাদ, পৃ. ১১৬–১১৭; বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৫, পৃ. ১১

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha